উৎসবের প্রাঙ্গনে আমরা : ওঁম জবাকুসুম সংকাশং

চট পূজা

সুপ্রতিক্ মৈত্র  :   রাম ও সীতা যখন ১৪ বছর বনবাস শেষে রাবণ বধ করে অযোধ্যা ফিরে আসেন। তখন রাবন বধের পাপ থেকে মুক্তি পাবার আশায় ঋষি মুনিদের পরামর্শ নেন। মুনি ঋষিদের কথা অনুযায়ী রাম সীতা তখন যজ্ঞের আয়োজন করেন। এবং সেই যজ্ঞ সম্পূর্ণ করতে মুদগল ঋষিকে আহ্বান করা হয়। মুদগল ঋষি তখন গঙ্গা জল ছিটিয়ে সীতাকে পবিত্র করলেন এবং রাবণ বধ এই পাপ থেকে মুক্তি পাবার জন্য কার্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে সীতাদেবীকে সূর্য দেবের উপাসনা করার আদেশ দিলেন। ঋষি কথামতো সীতা তখন ছয় দিন সূর্য দেবতার পূজা করলেন। আর সেসময় থেকেই এই পুজোর সূচনা হয়।

         মহাভারতেও ছট্ পুজোর উল্লেখ পাওয়া যায়। পুরাকালে রাজা ভোজের দুহিতা কুন্তী কুমারী অবস্থায় থাকাকালীন ভোজের গৃহে ঋষি দুৰ্বাসা অসুস্থ অবস্থায় উপস্হিত হয়। ঋষি দুৰ্বাসাকে শুশ্রুষা করার দায়িত্ব ভোজ কুন্তীকে দেয়। কুন্তীর শুশ্ৰুষাতে সন্তুষ্ট হৈয়া ঋষি দুৰ্বাসা কুন্তীকে এক বীজ মন্ত্র প্রদান করেন। সেই বীজ মন্ত্র পেয়ে কুন্তীর মনে কৌতুহল জন্মায় এই বীজ মন্ত্র থেকে কি ফললাভ হয় তা দেখার। ঋষি দুর্বাসা ভোজের রাজ্য থেকে প্রস্থানের পর একদিন প্রাত স্মরণে সূর্যদেবের আরাধনা উপাসনাতে সেই বীজ মন্ত্রটি প্রয়োগ করেন। কুন্তীর বীজ মন্ত্রর আরাধনা উপাসনাতে সন্তুষ্ট হৈয়া সূৰ্যদেব কুন্তীকে এক পুত্র সন্তান "দানবীর কৰ্ণ" দিলেন। মহাভারতে কুন্তি দ্বারা সূর্যের আরাধনা এবং কর্ণের জন্ম থেকেই এই পর্বের সূচনা। আবার পাণ্ডবরা যখন পাশা খেলায় নিজেদের সমস্ত রাজপাট হারিয়ে ফেলে তখন দ্রৌপদী ছট্ ব্রত করেন। দ্রৌপদীর মনোস্কামনা পুরণ হয় এবং পাণ্ডবরা তাঁদের রাজপাট ফিরে পান। 

   বিহার, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায়, যেখানে বিহারী বং‌শোদ্ভুতদের বাস, সেখানেই ধুমধাম করে পালিত হয় এই উৎসব। এছাড়া উত্তরপ্রদেশেও একটি বড় অংশে এই পুজোর প্রচলন রয়েছে। মোটামুটিভাবে এই অঞ্চলটিই মহাভারতের যুগে ‘অঙ্গদেশ’ বলে পরিচিত ছিল। এই অঙ্গদেশ ছিল কৌরবদের বা হস্তিনাপুর রাজবংশের অধীন। পাণ্ডব ও কৌরবদের শস্ত্র প্রতিযোগিতায় হঠাৎই আমন্ত্রণ ছাড়াই এসে পড়েন সুতপুত্র কর্ণ এবং এসেই অর্জুনকে প্রতিযোগিতায় আহ্বান জানান। কিন্তু কর্ণ তো আর রাজপুরুষ নন, তাই সেই প্রসঙ্গ তুলে তাঁকে প্রবল অপমান করেন ভীম। এই সময় সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন দুর্যোধন। কর্ণের তেজ ও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা দেখে তাঁকে দলে টানতে, সেই সময় তিনি কর্ণের জীবনের সবচেয়ে বড় উপকারটি করেন। তাঁকে অঙ্গদেশ দান করে, সেখানকার রাজা বলে ঘোষণা করেন। তখনও কিন্তু কেউ জানে না যে কর্ণ আসলে সূর্যের ঔরসজাত কুন্তীপুত্র। সেই প্রতিযোগিতার আসরে কুন্তী কর্ণকে চিনতে পারলেও কোন কিছু বলেননি। মুখ খুলেছিলেন সেই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে, পাণ্ডবদের বাঁচাতে যখন নিজে কর্ণের কাছে প্রস্তাব রাখেন পাণ্ডবপক্ষে চলে আসার জন্য। 

 তিনি যে সূর্যদেবের পুত্র, সেটা না জানলেও কর্ণ কিন্তু প্রথম থেকেই সূর্যের উপাসক ছিলেন। প্রচলিত আছে, অঙ্গদেশের রাজা হওয়ার পরে সেই অঞ্চলে ধুমধাম করে সূর্যদেবের পুজো ও উৎসবের প্রচলন করেন কর্ণ এবং সেই উৎসবই কয়েক হাজার বছর পেরিয়ে টিকে রয়েছে ছট্ পুজো হিসেবে। মহাভারতের গল্প অনুযায়ী কর্ণের শরীরে সব সময় থাকত একটি কবচ ও কুণ্ডল যা ছিল সূর্যদেবের আশীর্বাদ। ওই কবচ-কুণ্ডল থাকার জন্যেই তাঁকে বধ করা ছিল অসম্ভব। কৃষ্ণের পরামর্শ অনুযায়ী কর্ণকে দলে টানতে না পেরে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে সেই কবচ-কুণ্ডল ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে চেয়ে নিয়েছিলেন ইন্দ্র। ধর্মপ্রাণ ও দাতা বলে পরিচিত কর্ণ সেই অনুরোধ ফেরাতে পারেননি। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে এর পর তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু রাজা হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং তাই হয়তো তাঁর মৃত্যুর পরেও অঙ্গদেশের মানুষ ভক্তিভরে সূর্যষষ্ঠী ও ছট্ পুজো পালন করে এসেছেন এবং এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়েছে এই উৎসবের মাহাত্ম্য। 

 ছট্‌ অর্থাৎ ছটা বা রশ্মির পূজা। এই রশ্মি সূর্য থেকেই পৃথিবীর বুকে আসে। সুতরাং এই পূজা আসলে সূর্যদেবের পূজা। মনে করা হয় ছট্ দেবী সূর্যের বোন। তাঁকে সন্তুষ্ট করার জন্যই সূর্যের আরাধনা করা হয়। প্রত্যক্ষভাবে ‘ছট;-এর পূজা হলেও এই পূজার সঙ্গে জড়িত আছেন স্বয়ং সূর্যদেব, আছেন মা গঙ্গা এবং দেবী অন্নপূর্ণা।

       পৌরাণিক কাহিনীতে রয়েছে — বর্ষার আগমন ঘটেছে। কিন্তু বৃষ্টি তেমন হয়নি। চাষিদের মাথায় হাত। মাঠের ফসল মাঠেই মারা যাচ্ছে। মা অন্নপূর্ণা ক্রমশ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে থাকেন। সকল দেবতা মা অন্নপূর্ণার এহেন দুর্দশায় ব্যথিত। ঘরে ঘরে অন্নাভাব হাহাকার ওঠে। সূর্যের তাপ হ্রাস করে বাঁচার জন্য মা অন্নপূর্ণা সূর্যদেবের ধ্যান করতে শুরু করেন। তাতে হিতে বিপরীত হয়। সূর্যের প্রখর ছটায় মা অন্নপূর্ণা দিন দিন শ্রীভ্রষ্টা হয়ে ক্ষীয়মান হতে থাকেন। দেবলোকে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। দেবতারা সম্মিলিতভাবে সূর্যদেবের কাছে গেলে তিনি মা অন্নপূর্ণার এই দশার জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন এবং বলেন, মা অন্নপূর্ণা যেন গঙ্গাদেবীর আশ্রয় নেন। সূর্যদেব আরও বলেন, অস্তগমনকালে গঙ্গাদেবীর আশ্রয়ে থেকে কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতে এবং সপ্তমীর উদয়কালে মা অন্নপূর্ণা গঙ্গাদেবীর আশ্রয়ে থেকে উদীয়মান ছটা বা রশ্মিকে দেখে আমার স্তব বা ১২টি নাম উচ্চারণ করলে আমার স্মরণকারীকে সমস্ত পৃথিবী অন্নে পূর্ণ হতে থাকল। মা অন্নপূর্ণা আবার তাঁর শ্রী ফিরে পান। ছট্‌ পূজা বা ব্রত একাধারে সূর্যদেব, মা অন্নপূর্ণা ও গঙ্গাদেবীর পূজা।

       পুরাণে এ-ও উল্লেখ আছে, কার্তিক শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠীতে সূর্যাস্ত এবং সপ্তমীতে সূর্যোদয়ের মধ্যে বেদমাতা গায়েত্রীর জন্ম হয়। প্রকৃতির ষষ্ঠ অংশ থেকে উৎপন্ন শিশুদের রক্ষা করে থাকেন তিনি। তিনি বিষ্ণু দ্বারা রচিত মায়া। শিশু জন্মের ষষ্ঠ দিনে ষষ্ঠী দেবীর পুজো করা হয়। যাতে শিশুর কখনও কোনও প্রকার দুঃখ-কষ্ট না হয়।

         প্রিয়ব্রত নামে এক রাজা কে ঘিরে এই পুজোর ব্রতকথা প্রচলিত। রাজা প্রিয়ব্রতের কোনো সন্তান ছিল না। অনেক যাগযজ্ঞ করেও যখন তার পুত্র প্রাপ্তি ঘটে না তখন প্রিয়ব্রত ঋষি কাশ্যপের শরণাপন্ন হন। ঋষি কাশ্যপ অবশেষে প্রিয়ব্রতের পুত্র প্রাপ্তির জন্য বিশালাকার যজ্ঞ করান এবং যজ্ঞের আহুতি থেকে উৎপন্ন ক্ষীর প্রিয়ব্রতের স্ত্রী কে খেতে দেন। যদিও ক্ষীর খেয়ে রীতিমতো সন্তানের জন্ম দেন প্রিয়ব্রতের স্ত্রী। কিন্তু ভাগ্যক্রমে তাদের সেই সন্তানটিও মৃত হয়। তখন পুত্রের বিয়োগে শোকাহত রাজা প্রিয়ব্রত নিজের জীবন ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। ঠিক এমনি সময় ভগবানের মানস পুত্রী প্রিয়ব্রত কে দর্শন দিয়ে বলেলেন তিনি প্রকৃতির মূল ছয়টি অংশের মধ্যে তার সৃষ্টি। তাকে ষষ্ঠী ও বলা হয়।তিনি যেন তার পুজো দেন তবেই রাজার মনকামনা পূরণ হবে। এইভাবে রাজা সেদিন থেকে ছট্ মাতার পূজো করে দেবীর কৃপায় পুনরায় সুস্থ পুত্র সন্তান লাভ করেন।

  দীপাবলির ঠিক ছ-দিন পর পালিত হয় ছট্ উৎসব। ছট্ পুজো হল চার দিনের উৎসব। কার্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠীতে ছট্ ব্রতর বিধান রয়েছে। সূর্যের এই ব্রতে শক্তি এবং ব্রহ্মার উভয়ের পুজোর ফল পাওয়া যায়। তাই এই ব্রত সূর্যষষ্ঠীর নামে বিখ্যাত। এই ব্রত পালনে সূর্যদেবের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি আমাদের জীবনে যেমন বিঘ্ননাশক, দুঃখনাশক, তেমনি সুখদায়ক ও অর্থ-বৈভবদায়ক।

         এই ব্রতে তিন দিনের কঠোর উপবাসের বিধান রয়েছে। চতুর্থীর দিন থেকে এই ব্রত শুরু। এদিন পুরো দিনের উপবাস রাখা হয়। রাতে কাঠ বা মাটির উনুনে পায়েস এবং লুচি রান্না করা হয়। ভোগ লাগিয়ে সেই প্রসাদ খান মহিলারা। যাঁরা এই ব্রত করেন, তাঁদের পঞ্চমীর দিন নুন ছাড়া ভোজন গ্রহণ করেত হয়। ষষ্ঠীতে নির্জলা থেকে ব্রত করতে হয়। ষষ্ঠীতে অস্ত সূর্যের পুজো করে অর্ঘ্য নিবেদন করতে হয়। সপ্তমীর সকালে উদিত সূর্যকে অর্ঘ্য দিতে হয়। তার পর জল খেয়ে উপবাস পুরো করতে হয়। কোনও নদী বা পুকুরে গিয়ে এই পুজো করতে হয়।

এই ব্রতের বিশেষত্ব হল, বাড়ির যে কোনও সদস্য এই ব্রত করতে পারে। ছট্ পুজোর সময়ে বাড়ি পরিষ্কার ও পবিত্র রাখা হয়। এই ব্রতের বিশেষ প্রসাদ ঠেকুয়া।

ॐ জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্।
ধান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতঃ অস্মি দিবাকরম্।।

(তথ্যসূত্র: অন্তর্জাল)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।