উৎসব প্রাঙ্গনে আমরা : তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফেরে

   সুপ্রতিক মৈত্র :  ভোরে গঙ্গাস্নানে বেরিয়ে কৃষ্ণানন্দ দেখলেন, এক দরিদ্র বধূ গাছের গুঁড়ির উপর নিবিষ্ট মনে ঘুঁটে দিচ্ছেন। বাঁ হাতে গোবরের মস্ত তাল, ডান হাত উঁচুতে তুলে ঘুঁটে সেঁটে দিচ্ছে। নিম্নবর্গীয় কন্যা, গাত্রবর্ণ কালো, বসন আলুথালু, নগ্ন পিঠে আলুলায়িত কুন্তল, কপালের সিঁদুর লেপ্টে গেছে। পরপুরুষকে দেখে লজ্জায় জিভ কাটলেন বউমা। ছবিটি মানসপটে এঁকে গঙ্গামাটি নিয়ে মূর্তি গড়তে বসলেন কৃষ্ণানন্দ।

ক’দিন ধরেই পুজোয় বসে কালীসাধক কৃষ্ণানন্দ বায়না করেন, ‘এ বার সাকার রূপে দেখা দাও মা, মূর্তি গড়ে তোমার অর্চনা করি!’ নবদ্বীপে তখন বাসুদেব সার্বভৌম প্রচলিত দেবীঘটে কালীপুজোর চল। ‘…তিনি ঘটে ঘটে বিরাজ করেন, ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা যেমন’। কালীমূর্তি তখনও সাধকের কল্পনায় অধরা। কৃষ্ণানন্দের আবদারের উত্তরে ইচ্ছাময়ী তাঁর উত্তরসূরি রামপ্রসাদের দু’কলি শুনিয়ে দিতে পারতেন: ‘ধাতু, পাষাণ, মাটির মূর্তি/ কাজ কি রে তোর সেই গঠনে…’। কিন্তু সন্তানকে দুঃখ দিলেন না মা, বিধান দিলেন, মহানিশার অবসানে প্রাতঃমুহূর্তে কৃষ্ণানন্দ প্রথম যে নারীমূর্তি দর্শন করবেন, সেই মূর্তিই হবে ইচ্ছাময়ীর যথার্থ সাকার মূর্তি।
পরের দিন ভোরে গঙ্গাস্নানে বেরিয়ে কৃষ্ণানন্দ দেখলেন, এক দরিদ্র বধূ গাছের গুঁড়ির উপর নিবিষ্ট মনে ঘুঁটে দিচ্ছেন। বাঁ হাতে গোবরের মস্ত তাল, ডান হাত উঁচুতে তুলে ঘুঁটে সেঁটে দিচ্ছে। নিম্নবর্গীয় কন্যা, গাত্রবর্ণ কালো, বসন আলুথালু, নগ্ন পিঠে আলুলায়িত কুন্তল, কনুই দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে গিয়ে সিঁদুর লেপ্টে গেছে। এ হেন অবস্থায় পরপুরুষ কৃষ্ণানন্দকে দেখে লজ্জায় জিভ কাটলেন বউমা।— এই ছবিটিই মানসপটে এঁকে গঙ্গামাটি নিয়ে মূর্তি গড়তে বসলেন কৃষ্ণানন্দ।

      কৃষ্ণানন্দ রাজশাহীর সন্তান। বিধর্মীদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে সপরিবার আসেন নবদ্বীপে। সেখানে একই চতুষ্পাঠীতে তিনি চৈতন্যদেবের সহপাঠী। পরে ভাটপাড়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে হন কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। ‘তন্ত্রসার সাধক’ গ্রন্থে কৃষ্ণানন্দ মূর্তি-রহস্যও ব্যাখ্যা করেছিলেন। পিছু হটতে হয়েছিল মূর্তির অলঙ্কার আর সাজসজ্জার অনুসন্ধানে নেমে। গায়ে ন্যাতা জড়ানো ঘুঁটেকুড়ুনি দরিদ্র মেয়ের গায়ে গয়না পাব কেমন করে? নবদ্বীপ থেকে বর্ধমান গেলে ক্ষীরগ্রামে পাওয়া যাবে যোগাদ্যা ভদ্রকালী-কে। ভক্তের দেওয়া গয়নার ভরসায় না থেকে তিনি নিজেই বালিকার বেশ ধরে শাঁখারির কাছ থেকে শাঁখা পরে নিয়েছিলেন। 

গোল বাধিয়েছেন রামপ্রসাদ সেন। মূলত দুর্গাপ্রতিমার রূপসজ্জার প্রসঙ্গেই প্রচলিত হয়েছে ‘ডাকের সাজ’ কথাটা। অথচ এ সাজের উৎস খুঁজতে বসে সবচেয়ে প্রাচীন যে নমুনা হাতে এসেছে, তা রয়েছে রামপ্রসাদের গানে। আগমনী বা বিজয়ার গান নয়, খাঁটি শ্যামাসংগীত: ‘মন তোমার এই ভ্রম গেল না’ গানের এক জায়গায় পাচ্ছি, ‘...ওরে কোন লাজে সাজাতে চাস তাঁয় দিয়ে ছাড় ডাকের গহনা।।’ গানটির রচনাকাল? রামপ্রসাদ চর্চায় মগ্ন অধ্যাপক সর্বানন্দ চৌধুরীর অনুমান, ‘১৭২০ যদি রামপ্রসাদের জন্মের বছর ধরি, যদি বিদ্যাসুন্দর রচনা করার পর তিনি বিখ্যাত শ্যামাসংগীতগুলি রচনা করে থাকেন, তা হলে ১৭৫০-এর আগে গানটি রচিত হয়নি।’

 রামপ্রসাদের ‘ডাকের গহনা’ যে আদ্যোপান্ত বিদেশি দ্রব্য, তা বুঝতে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মালাকার’ গল্পে পৌঁছুতে হচ্ছে। ডাক সাজের শিল্পী রজনী মালাকারের আত্মবিশ্বাস ‘হাত আর চোখ-এ থাকতে তোয়াক্কা কারু করি না। মা ভৈ!’ গুণী শিল্পীর বিশ্বাসে চিড় ধরতে সময় লাগল না, স্বদেশি আন্দোলনের জোয়ার এল তেড়ে, ‘স্বরাজ স্বরাজ করিয়া সমস্ত দেশটা যেন পাগল হইয়া উঠিল।’ রায়বাড়ির কর্তা ঘোষণা করলেন, প্রতিমাসজ্জায় এ বার বিলেতি ডাকসাজ বন্ধ। বিদেশ থেকে আসা রাংতা-চুমকির কাজ আর চলবে না, তাঁরা খদ্দর দিয়েই প্রতিমা সাজাবেন। আকাশ ভেঙে পড়ল রজনী মালাকারের মাথায়। সব পুজো-বাড়িরই এক রা: বিলিতি ডাকসাজ চলবে না, চলবে না!

সাহিত্য থেকে ইতিহাসে এলেও এই পরিবর্তন দেখতে পাই। ‘গৌড়বঙ্গ সংস্কৃতি’তে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ও লিখছেন: ‘স্বদেশী আন্দোলনের প্রথম মহড়াতেই এই ‘ডাকসাজ’ বন্ধের আন্দোলন উঠিয়াছিল। কারণ শুনিয়াছিলাম রাংতা ও বাদলার গুটি বিদেশী।’ ‘ঢাকার ইতিহাস’-এ যতীন্দ্রমোহন রায়ও ডাকের সাজের বিদায় সম্পর্কে লেখেন, ‘স্বদেশী আন্দোলনের ফলে এই শিল্পটি বিনষ্ট হইয়া আর একটি অভিনব শিল্প ইহার স্থান অধিকার করিয়াছে। এক্ষণে অনেকেই জার্মান প্রভৃতি দেশ হইতে আগত রাং-এর পাত দ্বারা নির্মিত ডাকের সাজ দেবীর অঙ্গ ভূষিত করিতে অনিচ্ছুক; সুতরাং, ঢাকার এই শিল্পীগণ তৎস্থলে শোলার কাজ প্রস্তুত করিয়া ইহার অভাব পূরণ করিয়া থাকে।’ তবে অন্য ছবিও আছে। বিদেশি ডাকসাজ বর্জনে নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘মালাকর’ গল্পের যাদব মালাকরের জীবন তেমন বদলায়নি, জীবনভর বিয়ের আর অন্নপ্রাশনের টোপর, পুজোপার্বণের শোলার ফুল বানিয়েই কাটিয়েছেন।

         প্রশ্ন হল, কুমোরটুলির প্রাচীন বিদেশি ডাক সাজের শিল্পীরা তবে গেলেন কোথায়? পাশের পাড়া গরানহাটায়? গয়নাশিল্পে? অধুনা প্রয়াত মৃৎশিল্পী নিরঞ্জন পালের কাছে শুনেছি, ‘শুধু গরানহাটা কেন, শহরের সোনাপট্টিগুলিতে হয়তো কাজ খুঁজে নিয়েছিলেন ওঁরা। এ ব্যাপারে যাঁরা বলতে পারতেন, যেমন হরিপদ ঘোষ, কানাই নাথ, গুঁইরাম দাস, অ্যালবার্ট হরি— এঁরা কেউ আর বেঁচে নেই। সে কালের বিখ্যাত সব সাজশিল্পী এঁরা, কুমোরটুলির ডাকপট্টি-তে ছিল আস্তানা ওঁদের।’

                 হরিপদ ঘোষের পুত্র অমরনাথ দেখেছেন

শোভাবাজারের দুই রাজবাড়িতে, ছাতুবাবুদের বাড়িতে, পাথুরেঘাটার ঘোষবাড়িতে, শ্রীমানিবাড়িতে এবং দাঁ-বাড়িতে হরিপদবাবুর ডাক সাজের কাজ। সে কাজের নাম খানদানি কাজ। তখনও বড়বাজারের হুকোপট্টিতে পাওয়া যেত তামার ডাকপাত, রাংতা, রুপোর জরির প্যাকেট। কোনওটিতে লেখা মেড ইন সুইজারল্যান্ড, কোনওটিতে বেলজিয়াম। সেই ডাকপাত কেটে কেটে নকশা তুলতেন হরিপদবাবু। এই বর্ণনা শুনতে শুনতে আর এক খটকা উপস্থিত। ডাকসাজ বা ডাকের সাজ কথাটি চালু হওয়ার পিছনে ডাকযোগে সাজ আসার ব্যাখ্যা কতটা নির্ভরযোগ্য? বিশেষ করে ১৭৫০-এর কাছাকাছি সময়ে যখন রামপ্রসাদ ‘ডাকের গহনা’ লিখছেন? ‘কলিকাতা সেকালের ও একালের’ বইতে হরিসাধন মুখোপাধ্যায় তথ্য দিচ্ছেন: ‘আদেশ করা হইল, ‘কলিকাতা ও মুরশিদাবাদের মধ্যে নানা স্থানে ডাকচৌকি ও ডাক-পিয়াদা রাখা ইহবে।… ধরিতে গেলে, ইহাই কলিকাতার প্রথম ডাক ব্যবস্থা।’ ও দিকে ‘হুগলি জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ’-এ সুধীরকুমার মিত্র লিখছেন, ‘ওয়ারেন হেস্টিংসের সময় (১৭৭৪, ৩১ মার্চ) প্রথম ডাকের প্রচলন হয়।’ তা হলে? ডাক ব্যবস্থা সে ভাবে চালু হওয়ার আগেই ডাকের সাজ বা ডাকসাজ কিংবা ডাকের গহনা কথাগুলো চালু হল কী করে? চালু না হলে রামপ্রসাদের গানে সে কথা এল কী ভাবে?
ডাক কি তবে আসলে ডাচ? আচমকা শুনলে অবাক লাগতে পারে, তবে কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার নয়। প্রেক্ষিতটা বুঝতে একটু ইতিহাসে ফেরা যেতে পারে।

     ইতিহাসবিদ সুশীল চৌধুরি-র অভিমত, ‘বাংলায় ইউরোপীয় বাণিজ্যে গোড়া থেকে প্রাধান্য বিস্তার করে ডাচ আর ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ১৭৩০ নাগাদ ফরাসিরা। সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে অষ্টাদশ শতকের প্রথম দুই-তিন দশক পর্যন্ত ডাচ বাণিজ্য ইংরেজদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল।’ এবং এখানে লক্ষ করার ব্যাপার, সুধীরকুমার মিত্র ডাচদের সম্পর্কে লিখেছেন, ‘বাঙালিদের সহিত তাহারা খুব মেলামেশা করিতেন ও বাঙালিদের রীতিনীতি অনুসরণ করিতেন। বহু ওলন্দাজ বঙ্গ মহিলাকে বিবাহ পর্যন্ত করিয়াছিলেন।’ পাওয়া যাচ্ছে ডাচদের চাষবাসে আগ্রহের খবর, কড়াইশুঁটি (ওলন্দাশুঁটি) আমদানির তথ্য, দেবদ্বিজে ভক্তিরও কিছু নমুনা। ষণ্ডেশ্বর মন্দিরে ব্রোঞ্জের পঞ্চমুখ এবং পিতলের ঢাক উপহার দিয়েছিলেন ওঁরা। কনে বউ-এর মন্দির ঘিরেও রয়েছে ডাচ রহস্য। বরানগরেও ছিল ডাচদের কুঠি, যা থেকে কুঠিঘাট। এ দেশে একশো আশি বছরের উপনিবেশ, অথচ ইতিহাসের সাক্ষ্য নিশ্চিহ্নপ্রায়। তাই আপাতত উত্তর মেলে না, প্রশ্নটাই থাকে, ডাচ থেকে ডাক? ডাচের সাজ থেকে ডাকের সাজ? ডাকের গহনা? উত্তর না মিললেও নাকচ করা ঠিক হবে না। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় জানিয়ে রেখেছেন: ‘বাঙ্গলা অক্ষরে ইংরেজি শব্দ মূল ভাষার উচ্চারণের অনুগামী করিয়া লিখিবার চেষ্টা আমরা করি না কেন...বক্তার অজ্ঞাতসারে তাহার মুখের উচ্চারণের বাঙ্গালীপনা না আসিয়া থাকিতে পারে না।’ সেই জন্যই তো হল্যান্ডার থেকে ওলন্দাজ। অনুসন্ধান আরও জরুরি। আপাতত রামপ্রসাদ: মন তোমার এই ভ্রম গেল না…

(তথ্যসূত্র : অন্তর্জাল)

(নিচের ছবিটি বর্ধমানে সাধক শ্রী কমলাকান্ত প্রতিষ্ঠিত মায়ের মূর্তির)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।