ঐতিহ্যের অনুরণন , (পর্ব – ৮)

কাকোরী ট্রেন ষড়যন্ত্র

সুপ্রতিক মিত্র : লাখনৌয়ের হসরতগঞ্জ চৌরাস্তার কাছে ইংরেজরা রিং থিয়েটার নাম দিয়ে একটা বিরাট রঙ্গশালা বানিয়েছিলো । যেখানে প্রায়ই ব্রিটিশ অফিসারেরা তাদের পরিবার নিয়ে নানা ধরনের নাটক আর অন্যান্য অনুষ্ঠান দেখতে আসতেন । প্রথমে সেশন কোর্ট একটা পুরোনো স্কুল বাড়িতে বসলেও জায়গার সংকুলান না হওয়ায় অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই সেই রিং থিয়েটারে সেশন কোর্ট স্থানান্তরিত করা হয় | দু দফায় মোট তেরো মাস ধরে সেখানেই চলেছিল এই মামলা ।কাকোরী ট্রেন ডাকাতিতে মোট ৮ হাজার ৩০০ টাকার মতো অর্থ লুণ্ঠন হলেও এই মামলায় সরকারের তরফে খরচ হয়েছিল ১৩ লক্ষের বেশি টাকা । প্রথমদিকে বেশিরভাগ সাধারন মানুষ কাকোরী ট্রেন ডাকাতির ঘটনাটাকে অন্য পাঁচটা লুঠতরাজের ঘটনা ভাবলেও যত মামলা এগোতে লাগলো ততই সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠতে থাকলো বিপ্লবীদের অসামসাহসিক সেই কর্মকান্ডের তাৎপর্য | ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাকোরী কান্ডে অভিযুক্তদের মুক্তির দাবিতে স্বতঃস্ফূর্ত মিটিং মিছিল সংগঠিত হতে থাকে | ভারতবর্ষের প্রতিটা প্রান্তে দলমত নির্বিশেষে বিক্ষোভ কর্মসূচি নেওয়া হয় |
কাকোরী ট্রেন ডাকাতির অভিযুক্ত বিচারাধীন বন্দি হিসাবে সবাইকে প্রথমদিকে রাখা হয়েছিল লাখনৌ সেন্ট্রাল জেলে ।

      যে কোনো মূল্যে ব্রিটিশ সরকার তাদের ফাঁসিতে লাটকাবেই এটা রামপ্রসাদ বিসমিল খুব ভালোই বুঝতে পারছিলেন । তাই খুব গোপনে লাখনৌ জেল থেকে কয়েকজন সাথীকে নিয়ে বিসমিল পালানোর একটা প্ল্যান তৈরী করেছিলেন। কিন্তু এই দুঃসাহসিক পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপায়িত করতে গেলে বাইরে থেকে সাহায্য প্রয়োজন । শোনা যায় মহাবিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন এই কাজে এগিয়ে এসেছিলেন । কিন্তু কোনোভাবে এই খবর যুক্তপ্রদেশ পুলিশের গোয়েন্দারা জেনে ফেলে । তাই সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করা যায়নি ।

    তাই সাজা ঘোষণার পর আর ব্রিটিশ সরকার চার মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা-প্রাপ্ত বন্দীকে একসাথে একই জেলে রাখার সাহস পেলো না । পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিলকে পাঠানো হলো গোরখপুর জেলে । একই সময় আসাফুল্লা খানকে ফৈজাবাদ, ঠাকুর রোশন সিংহকে নৈনী আর রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়িকে গোন্ডা জেলে স্থানান্তরিত করা হয় । কাকোরী কান্ডে সাজাপ্রাপ্ত অন্যান্য বন্দীদেরও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হলো যুক্তপ্রদেশের বেরেলি, রায়বারেলি, আগ্রা, ফতেগরের মতো বিভিন্ন জেলে |

   আইনজীবীর পরামর্শে আসফাকুল্লা খান ফৈজাবাদ জেলে গিয়ে পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিলের সাথে আলোচনায় বসলেন । বিসমিল এখানে আসফাকুল্লাকে একটা খুব দামি কথা বলেছিলে যে দাবা খেলায় প্রতিপক্ষকে বাজিমাত করতে গেলে কখনো কখনো কয়েক ঘর পিছনের দিকেও চাল দিতে হয় | ফাঁসিতে ঝুলে মৃত্যুবরণ করলে তো সব শেষ । বরং কোনোভাবে মৃত্যুদণ্ডকে এড়িয়ে সেটাকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডে পরিবর্তিত করতে পারলে বছর সাতেক বাদে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে । আর তখন আরো বেশি শক্তি সঞ্চয় করে পূর্ণোদ্যমে ব্রিটিশ সরকারকে সমূলে উপড়ে ফেলা সম্ভব হবে । অনেক আলাপ আলোচনার পর আসফাকুল্লা খান বিসমিলের প্রস্তাবে রাজি হলেন ।

   ১৯২৭ সালের ১১-ই আগস্ট প্রথমবার আর ২১-সে আগস্ট দ্বিতীয়বার চিফ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিল, আসফাকুল্লা খান আর ঠাকুর রোশন সিংহ মার্সি পিটিশন দাখিল করেন । এদিকে আসফাকুল্লা খানের আইনজীবীর পরামর্শে তাঁর মা মাজহুর-উন-নিসার বেগম আলাদা ভাবে ভাইসরয় তথা গভর্নর জেনারেলের কাছে মৃত্যুদণ্ড মকুবের জন্যে লিখিত আর্জি জানান । কিন্তু কোনো আবেদনেরই কোনো উত্তর এলো না ।

    এখানে একটা কথা আলাদা ভাবে উল্লেখ করতেই হবে যে রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়ী কিন্তু কোনোরকম প্রাণভিক্ষার আবেদন করেননি । সম্পূর্ণ বিচার প্রক্রিয়া চলার সময় তিনি ছিলেন আশ্চর্য রকম শান্ত । বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর কোনো কৌতূহল ছিল না । এমনকি আদালতের রায় ঘোষণা সম্পর্কে তিনি ছিলেন প্রচণ্ড ভাবে উদাসীন ।

   এদিকে মার্সি পিটিশনের কোনো জবাব না আসায় সারা দেশের মানুষজন বিশেষ করে যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে এই অনৈতিক মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল অব্যাহত রইলো | একটা ডাকাতি আর তাতে একটা অনিচ্ছাকৃত মৃত্যুর ঘটনা | তার জন্যে চারজনের ফাঁসি ! সারা দেশ তখন উত্তাল | চাপে পড়ে দলমত নির্বিশেষে মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের অনুরোধ জানিয়ে যুক্তপ্রদেশের বিধানসভার সবার স্বাক্ষরিত একটা মেমোরেন্ডাম নৈনিতালে পাঠানো হলো যুক্তপ্রদেশের তৎকালীন গভর্নর উইলিয়াম মরিসের কাছে | এর সাথেই পণ্ডিত গোবিন্দ বল্লভ পন্থ আর সি ওয়াই চিন্তামণি চার অভিযুক্তের প্রাণভিক্ষার আবেদন জানিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে গভর্নরের কাছে আবেদন পত্র পাঠান | এসবের জবাবে ১৯২৭ সালের ২২-সে সেপ্টেম্বর হোম সেক্রেটারি এইচ ডব্লিউ হেগ ফাইনাল রিপোর্টে পরিষ্কার জানালেন যে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভাবে প্রমাণিত | এদের কার্যকলাপ দ্বারা এটা সম্পূর্ণ ভাবে প্রথিষ্ঠিত সত্য যে এদের উদ্দেশ্য একটা স্থাপিত সরকারের বিলয় সাধন | তাই যদি এদের চারজনকে ফাঁসির মতো কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়া হয় তবে শুধু বাংলায় আর যুক্তপ্রদেশে কেন, সমস্ত ভারতবর্ষেই অচিরে এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়বে |

(ক্রমশঃ)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

twelve + eleven =