ঐতিহ্যের সম্মাননা, (পর্ব ১০)

সুপ্রতিক মিত্র : জাগো নারী, জাগো বহ্নিশিখা

    চাকরির সূত্রে আমি এখন কৃষ্ণনগরে। কৃষ্ণনগর তথা বাংলার বিখ্যাত স্কুলগুলির মধ্যে অন্যতম কৃষ্ণনগর কলিজিয়েট স্কুল। এই মুহূর্তে এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনোরঞ্জন আমার ভাতৃপ্রতিম বন্ধু। ওর আমন্ত্রণে গতকাল গিয়েছিলাম ওর স্কুলে। স্কুলে যাওয়ার পথে পড়ল নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু প্রতিষ্ঠিত একটি ক্লাব। স্কুলে মনোরঞ্জনের ঘরে বসে গল্প করতে করতে ওই তুলল ওর স্কুলের সম্মানের ইতিহাস। সেই প্রসঙ্গেই উঠল প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক বেণী মাধব দাসের নাম। আমার চোখের সামনে থেকে যেন সরে গেল সময়ের এক পর্দা।

       1932 সালের 6ই ফেব্রুয়ারী, সিনেট হলে চলছে       কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসব । মঞ্চে উপস্থিত আচার্য  বাংলার গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসন ও আরও অনেক বিশিষ্ট অতিথি । একে একে তাদের হাত থেকে মানপত্র নিচ্ছে কৃতি ছাত্র ছাত্রীরা, শেষদিকে মঞ্চে উঠে এলো কনভোকেশন গাউন পরিহিতা এক বঙ্গ তনয়া। গভর্নর করমর্দন করার জন্য যেই হাত বাড়িয়েছেন অমনি গাউনের ভেতর থেকে বের করলো রিভলভার । পরপর পাঁচটা গুলি .... কিন্ত অনভিজ্ঞতার জন্য একটাও জ্যাকসনের দেহ স্পর্শ করলো না । দেহরক্ষীরা নিমেষে ধরে ফেলে তাকে, তারপর সেই চিরাচরিত প্রশ্ন,  কোথায় পেলে রিভলভার কে দিলো ? 

   শত অত্যাচারেও মুখ খোলাতে না পেরে পুলিশ লক আপে হাজির করলো বাবা , বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ বেণীমাধব দাসকে যিনি নেতাজীর শিক্ষক ছিলেন । অর্থাত তিনি একবার মেয়েকে বুঝিয়ে বলুন মুখ খুলতে ।

সেই মেয়ে তখন পুলিশকে বললো, কেন শুধু শুধু বাবাকে আনলেন, উনি কি আমাকে বিশ্বাসঘাতক হতে বলবেন!
প্রথমে ডায়াসেশন ও পরে বেথুন কলেজে পড়া মেধাবী এই ছাত্রীটির জন্য আদালতে রোজই হাজিরা দিতেন মিশনারী সিস্টাররা । বিচার কালে তার বিবৃতি শুনে হৈচৈ পড়ে গেল শুধু এদেশে নয় বিলেতেও । এতো শুধুমাত্র বিবৃতি নয় , classic literature !
আদালতে সিস্টাররা তার দৃঢ়তা দেখে বিচারককে বললেন,
“Just see, doesn’t she looks like Madonna ? “
তাদেরই অনুরোধে ফাঁসির বদলে হলো নয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ।
জেল থেকে মুক্তির পর তিনি কংগ্রেস দলে যোগ দেন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় আবার তিন বছরের জন্য জেলে যান ।

        স্বাধীনতার পর তিনি বিধায়ক নির্বাচিত হন এবং বিবাহ সূত্রে বিপ্লবী জ্যোতিষ ভৌমিকের সাথে আবদ্ধ হন । উদ্বাস্তু মহিলাদের পুনর্বাসনের কাজে সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ 1960 সালে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হন যদিও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য পেনশন প্রত্যাখান করেন। 
   1982 সালে স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানাদি না থাকায় নিসঙ্গতা তাকে গ্রাস করে এবং শান্তির আশায় সবকিছু ছেড়ে ঋষিকেশে থাকতে শুরু করেন ।

1986 সালের 26শে ডিসেম্বর প্রচন্ড ঠান্ডায় ঋষিকেশের বাসিন্দারা পথের ধারে এক মহিলার মৃতদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয় । পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে জানা যায় মৃত্যুর কারণ অপুষ্টি ও অনাহার । কোন দাবীদার না থাকায় পুলিশ সেই দেহ ছবি তুলে অঞ্জাতনামা লাশ হিসাবে পুড়িয়ে দেয় । মাসখানেক পর জানা যায় তিনি আর কেউ নন, বাংলার অগ্নিকন্যা বীণা দাস ।
দুর্ভাগা দেশে এক স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিধায়ক ও পদ্মশ্রীর কি করুণ পরিণতি ! ‌
১৯১১ সালে গতকালকের দিনে (২৪শে আগষ্ট) নদীয়ার কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেন বাংলার এই অগ্নিকন্যা । জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি ।

পরিশিষ্ট: শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ইংরাজী অনার্স B.A ডিগ্রি 2012 সালে (মরণোত্তর) প্রদান করে ‌।

তথ্যসূত্র : আমি সুভাষ বলছি, শৈলেশ দে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।