ঐতিহ্যের সম্মাননা , পর্ব – ৯

তুমি রবে নীরবে

সুপ্রতিক মিত্র : গতকাল বর্ধমান থেকে কলকাতা যাচ্ছিলাম কর্ড লিনে দিয়ে। এরকম তো মাঝেমাঝেই ফিরি। হঠাৎ ট্রেন যখন প্রায় কলকাতার উপকণ্ঠে বেলানাগার স্টেশনে এসে থামল, তখন ঝাঁকানি খেলাম বিধাননগর,নন্দকুমার, কৃষ্ণনগর…পূর্ব রেলের বিভিন্ন রেল স্টেশনের নাম, কিন্তু তাতে হয়েছেটা কি ? না হয়নি কিছুই তবে একটা জিনিষ কি খেয়াল করবেন সবই মহান ব্যক্তিদের নামাঙ্কিত স্টেশন । দেশে মহীয়সী মহিলাদের নামে স্টেশন খুবই কম।

   বেলা বোস কে চেনেন ? নিশ্চয়ই চেনেন , জানেন তার ফোন নম্বরও কিন্তু সেতো শুধুই গায়কের কল্পনা। আমাদের বেলা বসু (মিত্র) রক্ত মাংসের মানুষ বাস্তবে নেতাজির সেজদা সুরেশ চন্দ্র বসুর কনিষ্ঠ কন্যা । দিদি ইলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তাদের রাঙাকাকার অন্তর্ধানে ।

         জন্মেছিলেন ১৯২০ সালে তাদের কোদালিয়ার বাড়িতে। পারিবারিক সূত্রে বিপ্লবী আন্দোলনে প্রবেশ, ১৯৪০ সালে রামগড়ে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস অধিবেশন পরিত্যাগ করে নেতাজী যে আপোস বিরোধী সম্মেলনের ডাক দেন, সেখানে বেলা ছিলেন নারী বাহিনীর প্রধান।

আজাদ হিন্দ ফৌজের গুপ্তচর বিভাগের অন্যতম প্রধান হরিদাস মিত্রের সাথে বিয়ে হয় ১৯৩৬ সালে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে আরো তিন বিপ্লবী জ্যোতিষচন্দ্র বসু, পবিত্র রায়, অমর সিং গিলের সাথে হরিদাস মিত্রও ধরা পড়েন। রাজদ্রোহের অভিযোগে ১৯৪৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আদেশ হয় তাদের মৃত্যুদন্ডের । মহাত্মা গান্ধীর চেষ্টায় শেষমেশ সবার মৃত্যুদন্ড মকুব হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা হয় ।

   পূর্ব এশিয়া থেকে আজাদ হিন্দ ফৌজের যে বিভিন্ন দলগুলি নেতাজী ভারতে প্রেরণ করেন তাদের সাথে যোগাযোগ রাখা ও নিরাপদে অবতরণ করানোর দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল বেলার ওপর। ১৯৪৪ এর জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কলকাতার এক গোপন স্থান থেকে সিংগাপুরে ট্রান্সমিটারে সংবাদ আদান প্রদান ও নিরাপদে বিপ্লবী দের নির্দিষ্ট জায়গায় পৌছে দেন বেলা মিত্র। হরিদাস মিত্র গ্রেপ্তার হলে তিনি এই কাজ পরিচালনার দায়িত্ব নেন । নিজের অলংকার বিক্রি করে সেই অর্থে কর্মীদের নিরাপদে আনা ও থাকার ব্যবস্থা করেন। বহু বাধা বিঘ্ন সত্ত্বেও উড়িষ্যার উপকূলে লোক পাঠিয়ে তাদের অবতরনের ব্যবস্থা করেছিলেন বেলা দেবী। 

  ।দেশ স্বাধীন হবার পর মিত্র মশাই কংগ্রেসের হয়ে নির্বাচনে জিতে বিধানসভায় ডেপুটি স্পিকার হন ।ইনি অবশ্য রাজনীতিতে না এসে 'ঝাঁসির রানী' নামে সেবাদল গঠন করেন । মূল কাজ ছিল পূর্ববঙ্গ থেকে আগত অগণিত উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন। এছাড়া আরও অনেক উন্নয়নমূলক কাজে নিজেকে নিয়োগ করেন। বালি-ডানকুনির কাছে অভয়নগরে উদ্বাস্তুদের পূনর্বাসন দেওয়ার জন্য শিবির তৈরি করে সেখানেই থাকতেন তিনি । অক্লান্ত পরিশ্রমে স্বাস্থ্য ভেঙ্গে যায়, পড়েন কঠিন অসুখে । অবশেষে ১৯৫২ সালের জুলাই মাসে এই মহিয়সী নারীর জীবনাবসান হয় ।

  নাম শোনেননি ? স্বাভাবিক, পর্দার আড়ালে থেকেই কাজ করে গেছেন আজীবন। দিদি ইলার মতো স্বাধীনতার ইতিহাসে তেমন ভাবে স্বীকৃতি ও পাননি। তবে এনাকে না চিনলেও পুত্র কে নিশ্চয়ই চেনেন.....পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী ও ফিকির প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল অমিত মিত্র মহোদয় ।

  তাঁকে সম্মান জানাতে ভারতীয় রেল হাওড়া বর্ধমান কর্ড লাইনে ঐ উদ্বাস্তু শিবিরের কাছাকাছি স্টেশন টির নামকরণ করে বেলানগর ।

কোনো মহিলার নামে স্টেশনের নামকরণ এদেশের রেলের ইতিহাসে বোধ হয় এটাই প্রথম!

( তথ্যসূত্র : অন্তর্জাল)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।