পুরাণের পথ ধরে : অরূপ বীণা রূপের আড়ালে

 আসুন জেনে নিই মা কালীর আট প্রকার কালিকা রূপের বর্ণনা।

সুপ্রতিক মৈত্র : আট প্রকার দেবী কালিকার রূপ। যথা- দক্ষিণাকালী, মহাকালী, শ্মশানকালী, গুহ্যকালী, ভদ্রকালী, সিদ্ধকালী, আদ্যাকালী ও চামুণ্ডাকালী।

দক্ষিণাকালীঃ- এই দক্ষিণা কালিকাই আমাদের বহুপূজিতা শ্যামাকালী। এই দেবী ঘনঘোরবর্ণা , চতুর্ভুজা, আলুলায়িত কুন্তলা, ত্রিনয়না- দিগম্বরী । কন্ঠে পঞ্চাশ টি শ্বেত, পীত, রক্ত ও কৃষ্ণ বর্ণের মুণ্ডমালা শোভা পাচ্ছে। কোমোরে পীত বর্ণের করের বন্ধনী। চারহস্তের বাম হস্তে উপর নীচে যথাক্রমে রুধিরাসিক্ত খড়্গ, মুণ্ড – দক্ষিণ হস্তে ওপরে নীচে অভয় ও বরমুদ্রা শোভিতা। মায়ের দক্ষিণ চরণ অগ্রে শায়িত শিবের বুকে, বাম চরণ পেছনে। দেবী লোলজিহ্বা, দুপাশে গলিত রুধির ধারা। কর্ণে মৃতদেহের কুণ্ডল, দেবীর মুখে ভয়ংকরী ও করুণার অপূর্ব ভাবের সংমিশ্রণ । দেবীর চতুর্দিকে শ্মশানে শিবাবাহিনী ঘোর রবে দেবীর জয়ধ্বনি করছেন। দক্ষিণ দিকের অধিপতি যম এই দেবীর নাম শুনে পলায়ন করেন, তাই ইঁনি দক্ষিণা কালী। এই দেবীর উপাসক দের যম ভয় থাকে না ।

মহাকালীঃ- মার্কণ্ড পুরাণে এই দেবীর বর্ণনা আছে । সৃষ্টির আদিতে ভগবান বিষ্ণুর কর্ণমলজাত মধু ও কৈটভ নামক দুই দানব প্রজাপতি ব্রহ্মাকে গ্রাস করতে উদ্যত হলে , ব্রহ্মা তখন যোগনিদ্রায় মগ্ন হরিকে স্তব করেন। কিন্তু ভগবান বিষ্ণু তখন যোগনিদ্রার প্রভাবে আচ্ছন্ন হয়ে আছেন দেখে ব্রহ্মা তখন হরিনেত্রনিবাসিনী সেই দেবীর স্তব করলেন। ব্রহ্মার স্তবে তুষ্ট হয়ে দেবী , মহাকালী রূপে প্রকট হলেন। যোগনিদ্রা থেকে মুক্ত হয়ে ভগবান বিষ্ণু ঐ দুই দানবকে বধ করেন। এই দেবীর দশ মুখ, দশ হাত, দশ চরণ। তনু নীলকান্ত মণির মতো উজ্জ্বল। ত্রিনয়না দেবী খড়্গ, বাণ, ধনুক, শঙ্খ, চক্র, ত্রিশূল, গদা, পরিঘ- ভূষ্ণণ্ডী , নরমুণ্ড ধারন করে আছেন।

শ্মশানকালীঃ- শ্মশানে এই দেবীর পূজা হয়। গৃহস্থ বাড়ীতে এঁনার পূজা বা এঁনার ছবি রাখা হয় না । তন্ত্র সাধকেরা বীরাচারে এই দেবীর আরাধনা করেন । কাজলের পাহাড়ের মতো ইঁনি ঘন কৃষ্ণবর্ণা , শ্মশান বাসিনী, রক্তবর্ণ নেত্র, আলুলায়িত কেশ, কারণ- মাংস পূর্ণ পাত্র ধারিনী ও ভক্ষণকারিণী, ডান হস্তে নর মুণ্ড, বাম হস্তে পান পাত্র, অতি উজ্জ্বল অলঙ্কার ধারিনী। পূর্বে ডাকাতেরা এই দেবীর কাছে পূজা দিয়ে ডাকাতি করতে যেতো ।

গুহ্যকালীঃ- নামেই এঁনার পরিচয় পাওয়া যায়। ইঁনি সাধন জগতে অতি গুহ্য মূর্তি। বীরভূমে আকালীপুরে এই দেবীর মন্দির আছে। এঁনার গাত্র ঘন মেঘের ন্যায় কৃষ্ণা, কৃষ্ণবস্ত্র পরিধানা , লোলরসনা, শ্বেত দন্তরাশি বিকট ভাবে ব্যাদিত, চোখ কোটোরগত, মুখে অদ্ভুদ হাসি , কণ্ঠে মুণ্ডমালা, স্কন্ধে সর্প উপবীত, ত্রিনেত্রা দেবীর মস্তকের জটারাশি গগনচুম্বী । দেবীর সাথে প্রচুর সর্প থাকে, দেবী সর্প বলয় ও সর্প নূপুর ধারণ করেন, শব দেহের কুণ্ডল ধারণ করেন কর্ণে, দুইহাতে বরাভয় মুদ্রা। অট্টহাস্যকারিনী এই দেবী সাধক দের অভিলাষ পূর্ণ করেন ।

ভদ্রকালীঃ- “ভদ্র” শব্দের অর্থ মঙ্গল। জীবের অন্তিমকালে যিঁনি মঙ্গল বিধান করেন তিঁনিই ভদ্রকালী। দক্ষযজ্ঞ নাশের সময় একবার এঁনার আবির্ভাব হয়েছিলো। কালিকাপুরাণ মতে দেবী ষোড়শভুজা ভদ্রকালী রূপে মহিষ মর্দন করেন । কালিকাপুরাণ মতে ভদ্রকালী অতীব সুন্দর। অতসীপুস্পের ন্যায় গাত্র বর্ণ, মস্তকে জটায় উজ্জ্বল মুকুট, ললাটে অর্ধ চন্দ্র, কন্ঠে উজ্জ্বল নানা হার- নাগহার। অস্ত্রাদি দ্বারা সজ্জিত এই দেবীর পদতলে বাহন পশুরাজ থাকেন, দেবী বাম চরণে মহিষকে চেপে তাহাকে বধ করেন । তন্ত্রে এই দেবী ‘কালী’ রূপেই পূজিতা। এখানে তাঁহাকে ক্ষুধায় কাতরা, খীনাঙ্গী, নেত্র কোটরগ্রস্ত, আলুলায়িত কেশা ও সর্বদা ক্ষুধায় কাতর রূপে বর্ণনা করা হয়েছে । দেবী এমন ভয়ঙ্করী রূপ হলেও অমঙ্গল ও ভয়-ভীতি হরণ করেন। তাই তো তিঁনি “ভদ্রকালী” নামে পূজিতা।

সিদ্ধকালীঃ- ইঁনি দ্বিভুজা । দক্ষিণ হস্তের উত্তোলিত খড়্গের দ্বারা চন্দ্রমণ্ডল ভেদন করেন। সেই চন্দ্র থেকে নির্গত অমৃত ধারায় দেবীর অভিষেক হচ্ছে- এমন রূপ। দেবী ত্রিনয়না, মুক্তকেশী, দিগম্বরী। কটিতে হস্তের মেখলা, মস্তকে মুকুট, গাত্রে অতি উজ্জ্বল নানা অলঙ্কার শোভিত। কর্ণে চন্দ্র ও সূর্যের ন্যায় দুটি কুণ্ডল। নীল বর্ণ, লোল জিহ্বা। ইঁনি মহাদেবের বুকে বাম চরণ স্থাপন করে আছেন, দক্ষিণ চরণ পেছনে।

আদ্যাকালীঃ- মহানির্বাণ তন্ত্রে এই দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। আদ্যাপীঠের কালী আর দেবীর রূপ কিন্তু এক নয় এবং আদ্যা স্ত্রোত্রের দেবীও ইনি নন। আদ্যাকালীর রং মেঘের ন্যায় নীল, কপালে চন্দ্ররেখা, ত্রিনেত্রা ও রক্তবস্ত্র পরিধানে থাকে। প্রস্ফুটিত রক্তপদ্মে দেবী আসীনা হয়ে মাধ্বীক পুস্পের মিষ্টি সুধাপান করে সম্মুখে নৃত্যরত মহাকালের নৃত্য দর্শন করে আনন্দিতা ইঁনি ।

চামুণ্ডাকালীঃ- এঁনার পূজা দুর্গাপূজার সময় সন্ধিক্ষণে করা হয় । মার্কণ্ড পুরাণের শ্রীশ্রীচণ্ডীতে এই দেবীর উল্লেখ আছে । চণ্ড ও মুণ্ড বহু সেনা নিয়ে দেবী কৌশিকীর সাথে যুদ্ধ করতে গেলে দেবী কৌশিকীর ভ্রু যুগলের মধ্যে থেকে এঁনার আবির্ভাব হয় । ভয়ঙ্করী এই চামুণ্ডাকালীর মূর্তি। কালিকাপুরাণে এই চামুণ্ডাকালী দেবীকে নীল পদ্মের ন্যায়, চতুর্ভুজা বলা হয়েছে। অতি রুগ্ন শরীর, বিশাল দন্ত, লম্বা দেহ, মুখে লোল জিহ্বা। এই দেবীই রক্তবীজ অসুরের রক্ত পান করেছিলেন । ইঁনি চণ্ড ও মুণ্ড নামক অসুর দ্বয়কে নিহত করেছিলেন । অগ্নিপুরাণে দেবী চামুণ্ডার আট মূর্তির উল্লেখ আছে। যথা- রুদ্রচর্চিকা, রুদ্রচামুণ্ডা, মহালক্ষ্মী, সিদ্ধচামুণ্ডা, সিদ্ধযোগেশ্বরী, রূপবিদ্যা, ক্ষমা, দন্তুরা ।

এছাড়াও আরো বহু প্রকার কালী মূর্তির কথা শাস্ত্রে পাওয়া যায় ।

এছাড়াও শাস্ত্রে আরোও কালী মূর্তির উল্লেখ আছে। বামা কালী, নিশা কালী, ধন কালী, বেতালবাহনা কালী, রুদ্রকালী, সংহার কালী ইত্যাদি এমন অনেক। তবে সব রূপের পূজা কিন্তু গৃহস্থ বাড়ীতে হয় না। গৃহস্থ লোকেরা বা সাধারন পুরোহিত সব রূপের পূজা করতে পারেন না।

(ছবিটি বর্ধমানে আমার বাড়ির কাছেই বড়মা কালীর)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।