সুপ্রতিক মিত্র : তব অচিন্ত্যরূপ চরিত মহিমা

  আগামীকাল মহালয়া, পিতৃপক্ষের শেষ। দেবী পক্ষের পদধ্বনি। দেবী জগজ্জননী মহামায়ার চরণ কমলে নিজের হৃদয় উজাড় করে অঞ্জলি দিলাম এই লেখার মাধ্যমে।

 দেবী আদ্যাশক্তি মহামায়া সত্ত্বগুণে বিষ্ণুর ঘরণী লক্ষ্মী, রজঃগুণে ব্রহ্মনি আর তমঃগুণে শিবের শক্তি শিবাণী। তিনি কখনো ঋষিকন্যা কাত্যায়নী, কখন হিমালয় কন্যা শৈলপুত্রী, স্কন্দের মাতা আবার কখনো উগ্রচন্ডা কালরাত্রি। কখনো তিনি দ্বিভূজা, কখনো চতুর্ভুজা, কখনো দশভূজা কখনো বা অষ্টাদশভূজা। দেবীর এইরূপ নয়টি রূপের সমন্বয় কে আমরা আশ্বিন মাসের দেবী পক্ষের প্রতিপদ থেকে শুরু করে নবমী পর্যন্ত পূজা করি। এনারাই একত্রে নবরাত্রি নামে পরিচিতা।

নবরাত্রির পরিচিতি : এই নবরাত্রির পূজায় একটি দেবীর পূজো হয় না এমনকী হতেও পারেনা, দেবী মহামায়া ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপে আবির্ভূতা হয়েছেন! আর সেই রূপগুলির প্রতিষ্ঠা করে পূজা করাই হচ্ছে প্রকৃত পক্ষে নবরাত্রি পূজা।

কিন্তু এই রূপগুলি কি বা কত প্রকার ? আগে সেটাই জানতে হবে! মূলত দেবী মহামায়ার রূপ নয়টি! আর মায়ের এই নয়টি রূপের নামগুলি হচ্ছেঃ

১) শৈলপুত্রী ২) ব্রহ্মচারিণী ৩) চন্দ্রঘন্টা ৪) কুষ্মাণ্ডা
৫) স্কন্ধমাতা ৬) কাত্যায়নী ৭) কালরাত্রী ৮) মহাগৌরী
৯) সিদ্ধিধাত্রী

প্রিয় সনাতনী সুধী, এইগুলিই হচ্ছে মায়ের নবরূপ, নবশক্তি তথা নবরাত্রি! আসুন, এখন আমরা সবাই নবদুর্গার নয়টি রূপতথ্য ও রূপের শক্তি সম্বন্ধে জ্ঞাত হই..

🌺 শৈলপুত্রীঃ নবদূর্গার প্রথম রূপ শৈলপুত্রী, হিমাবন গিরি রাজের কন্যা বলে তিনি শৈলপুত্রী নামে খ্যাত হন। ইনি বৃষভ বাহনা। ইনি দ্বিভূজা হাতে ত্রিশূল আর পদ্ম। নবরাত্রি পূজায় অর্থাৎ মহালয়ার পর প্রতিপদের দিন মায়ের এইরূপের ধ্যান করা হয়।

🌺 ব্রহ্মচারিণীঃ এটি মায়ের দ্বিতীয় রূপ, মা এখানে নিজেই সাধিকা ব্রহ্মচারিণী রূপে প্রকাশিত এবং এইরূপেও মা দ্বিভূজা, হাতে অক্ষমালা এবং কমন্ডুলু। দ্বিতীয়াতে এই মায়ের ধ্যান ও পূজা করার নিয়ম। ইনি বৈরাগ্য, সদাচার, সংযম ভক্তকে দান করেন।

🌺 চন্দ্রঘন্টাঃ এইটি নবদূর্গার তৃতীয় রূপ, ইনি কল্যাণী রূপে আবির্ভূত এবং তিনি তাঁর ভক্তদের বা সন্তানদের কল্যাণ দান করেন। এই রূপে মায়ের দশ হাত এবং মা বাঘ্রবাহনা। তৃতীয়াতে মায়ের এই রূপের বন্দনা ও পূজো করার নিয়ম।

🌺 কুষ্মাণ্ডাঃ মায়ের চতুর্থ রূপ কূষ্মান্ডা, এই রূপে মায়ের অষ্টভূজা এবং মা বাঘের উপর সমাসীন। চতুর্থীতে মায়ের এই রূপের আরাধনা ও পূজো করা হয়। এই রূপে মা ভক্ত ও সন্তানদের ব্যাধি থেকে মুক্ত করে ইহলৌকিক ও পরলৌকিক সমৃদ্ধি দেন।

🌺 স্কন্ধমাতাঃ নবদুর্গার পঞ্চম রূপ স্কন্ধমাতা! দেব সেনাপতি কুমার কার্তিকের মাতা, তাই তিনি স্কন্দমাতা। মাতা এই রূপে চতুর্ভূজা ও সিংহ বাহনা। কোলে কার্তিককে নিয়ে মাতা বিরাজমান এবং পঞ্চমীতে মায়ের ধ্যান ও পূজো করার নিয়ম। এই রূপে মাতা বাঞ্চাকল্পতরু।

🌺 কাত্যায়নীঃ ঋষি কাত্যায়নের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মা আদ্যাশক্তি তার ঘরে আসেন, তাই তাঁর নাম কাত্যায়িনী! এই রূপেও মা সিংহবাহনা এবং চতুর্ভূজা। এই রূপে মাতা মানুষকে নিজ নিজ উপাস্য বা ইষ্ঠ ভগবানের পথে মতি প্রদান করেন। বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ মাতা কাত্যায়নী ব্রত ও পূজো করেছিলেন এবং ব্রজের গোপীদের কাত্যায়নী করতে বলেছেন। দুর্গাপূজার ষষ্ঠ দিনে কাত্যায়নী ধ্যান ও পূজা করা হয়।

🌺 কালরাত্রিঃ এইরূপে সপ্তমীতে মায়ের পূজা করা হয় কিন্তু এইরূপে তিনি ভয়ঙ্কররূপী অন্ধকারবর্ণা এবং চতুর্ভূজা ও গর্বভবাহনা। ভয়ঙ্কররূপী অন্ধকারবর্ণা হলেও মা কখনও দুঃখ দানকারী নন। তাই এইরূপেও তিনি সবার মঙ্গল করেন এবং কালরাত্রি মঙ্গলদায়িনী নামে খ্যাত হন। সপ্তমীতে মায়ের এইরূপের ধ্যান ও পূজা করা হয়।

🌺 মহাগৌরীঃ এইটি মায়ের অষ্টম রূপ। এইরূপে মায়ের গৌর বর্ণের, চতুর্ভূজা এবং বৃষভ বাহনা, অষ্টবর্ষা অভেদ গৌরী। তাই এখানে মায়ের আটবছর বয়সী মানা হয়! ইনি অপ্রাপ্ত বয়স্কা বালিকা রূপী। এই রূপ থেকেই মহা অষ্টমীতে কুমারী পূজার আবির্ভাব ও প্রচলন এসেছে। এমনকী চন্ডীতে বলা হয়েছে “স্ত্রিয়ঃ সমস্তাঃ সকলাজগৎসু” অর্থাৎ জগতের সকল স্ত্রী তোমার অংশ স্বরূপ। যদিও সকল স্ত্রীজাতি সম্মানের। তাই অষ্টমীতে দেবীর সামনে অষ্টমবর্ষীয় বালিকাকে বসিয়ে যথার্থ উপাচারে দেবী জ্ঞানে বন্দনা করা হয় এবং স্ত্রীজাতিকে এর চেয়ে বৃহৎ সম্মান বোধ হয় কেউ দেয়নি।

🌺 সিদ্ধিধাত্রীঃ মাতা নবদূর্গার নবম রূপশক্তি সিদ্ধিদাত্রী নামে পরিচিত, এইরূপে মায়ের চতুর্ভজ ও পদ্মাসনে বিরাজমান। মাতা এইরূপে ভক্তদের সর্বপ্রকার সিদ্ধি দান করেন। দূর্গা পূজার নবমীতে মায়ের আরাধনা ও পূজো করা হয়।

🌺 অপরাজিতাঃ প্রতিপদ হইতে নবমী পর্যন্ত মায়ের অলৌকিক ও মঙ্গলদায়িক নয়টি রূপের অর্থাৎ নবদুর্গার পূজো শেষ করে, দশমীতে অপরাজিতা পূজো করে মায়ের পূজোর অবসান তথা বিসর্জন প্রক্রিয়া করা হয়। এর মধ্যে দিয়ে নবদুর্গা বা নবরাত্রি পূজোর সমাপ্তি ঘটে কিন্তু অপরাজিতা পূজো নবদুর্গার তালিকায় আসে না বা পড়ে না! এই পূজো শুধুমাত্র বিসর্জন প্রক্রিয়াকরণের জন্য, তবে এইটুকু জানা যায় দশমী পূজো অপরাজিতা বলা হয় এইজন্যই কেননা মা অজিতা! বিসর্জন দেওয়া শুধুমাত্র মায়ের রীতির ইতি দেওয়া কেননা মা সর্বদা সর্বত্রই বিরাজিত তাই তিনি অপরাজিতা।

দেবী প্রপন্নার্তিহরে প্রসীদ
প্রসীদো মাতোর্জগতহখিলস্য
ত্বমীশ্বরী দেবী চরাচরস্য।

আধারোভূতা জগতস্ত্বমেকা
মাহী স্বরূপেণ যতঃস্থিতাসি ।।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

14 − four =