সাতকোশিয়া ভ্রমণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দেবরাজ ঘোষঃ অফিসের কয়েকদিনের ছুটি পাওয়াতে একদিন রাতে খাওয়ার টেবিলে আমি এবং আমার গিন্নির মধ্যে বেড়াতে যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠল। কোথায় যাই, কোথায় যাই ভাবতে ভাবতেই দুজনে একবাক্যে জঙ্গলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। শুধু জঙ্গল নয়, তার সঙ্গে যদি পাহাড়, নদী থাকে তো আরও ভাল হয়। তাই অনেকদিন ধরে সাতকোশিয়ার কথা ভাবছিলাম। সেটাই যখন গিন্নীকে বললাম, দেখলাম সেও রাজি হয়ে গেল। তাই সাতকোশিয়া যাবার প্রোগ্রাম ফিক্সড করেই ফেললাম একপ্রকার।

আসলে সাতকোশিয়া নিয়ে এতই শুনেছি যে, সেটা আমার উইশ লিস্টের মধ্যেই ছিল। তাই আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং তার গিন্নিকেও রাজি করানো গেল। ২৩-২৬ জানুয়ারী সময়টা ভাল সময় বুঝে দুরাত্রের জন্য তাঁবু বুক করে সেইমতো ট্রেনের টিকিট কেটে বেরিয়ে পড়লাম।

রাতে ট্রেনে উঠবো, সকাল সকাল ভুবনেশ্বর নেমে সেখান থেকে গাড়িতে ঘন্টা তিনেকের পথ। সাতকোশিয়া জায়গাটা উড়িষ্যাতে। আসলে, মহানদীর প্রবাহপথের এই সাত ক্রোশ বা চোদ্দ মাইল পথের এলাকাকেই বলা হয় সাতকোশিয়া। হয়তো এর এরকম অবস্থানের জন্যই এর নাম সাতকোশিয়া। পুরো এলাকাটা পাহাড়ে ঘেরা বলে একে ‘সাতকোশিয়া গর্জ’ও বলা হয়।

যাওয়ার দিন সময়মতো স্টেশনে পৌঁছে ট্রেনে চেপে বসলাম আমরা চারজন।
পরেরদিন ভোরবেলা ভুবনেশ্বর নেমে অটো নিয়ে পৌঁছে গেলাম যেখান থেকে আমার গাড়ি নেওয়ার কথা।
কলকাতা থেকেই জুম কার থেকে গাড়ি বুক করে রেখেছিলাম। ভুবনেশ্বর থেকে বাদমুল ১২২ কিমি।
রাস্তা খুব ভালো,ঘন্টা তিনেক সময় লাগে। প্রতিদিনের জন্য গাড়ি নিয়েছিলো হাজার টাকা করে, তেল নিজের। আমি প্রথম দিনই হাজার টাকার তেল ভরে নিয়েছিলাম। তারপর আর ভরতে হয়নি।

তিনহাজার টাকা জমা রাখতে হয়েছিল, যদি গাড়ির কোনো ক্ষতি হয়, তবে ওখান থেকে কাটা যাবে। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর রাস্তার ধারে ধাবায় প্রাতরাশ করেও সাতকোশিয়া বাদমুল পৌঁছতে আমার তিন ঘণ্টার বেশি লাগেনি।

পৌঁছে প্রথমেই অবাক হয়ে যাই। নদী, বন, পাহাড় মিলেমিশে যেন এখানকার সৌন্দর্য রচনা করে রেখেছে। দেখলেই যেন নিজেদের সজীবত্ব ফিরে আসে। মনে হয়, দুদিনের জন্য হলেও শহুরে দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি, অবসন্নতা কাটিয়ে আবার নিজেদের রিচার্জ করে নেওয়া যেতেই পারে। আর পর্যটকদের সক্রিয়তা বাড়ানোর জন্য সেখানকার বন উন্নয়ন দপ্তরও নিজেদের সাধ্যমতো প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। পূর্বঘাট পর্বতমালা চিরে বয়ে গেছে মহানদী আর সেই মহানদীর চর থেকে শুরু করে পাহাড়ের গা পর্যন্ত ধাপে ধাপে তৈরি করা হয়েছে এসি কটেজ, এবং তাঁবুও। যে যেখানে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

ভোরবেলা মহানদীর তীরে দাঁড়ালে যতদুর চোখ যায় শুধু সাদা চকচকে বালি আর বালি। তারই মাঝে স্বচ্ছ টলটলে জল পূর্বঘাট পর্বতমালাকে যেন দুভাগ করে দিয়ে বয়ে গেছে। শান্ত, নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে শুধুই পাখির কলকাকলি। নানানধরনের রংবেরং এর পাখি যেন ভোরের শুভ্র আকাশে ক্যানভাসের মতো রঙের প্রলেপ এঁকে দিচ্ছে। যেন মনে হয় এই নিস্তব্ধতাতেই নিশ্চিন্তে দিন কাটিয়ে দেওয়া যায়। যাই হোক, আসল কথায় ফেরা যাক, আসলে এটা টাইগার রিজার্ভ ফরেস্ট হলেও এখানে টাইগার ততটা দেখা যায় না। বেশ কিছুদিন আগে বান্ধবগড় থেকে সুন্দরী আর কানহা থেকে মহাবীর নামক দুটি বাঘকে নিয়ে এসে এখানে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কয়েকদিনের মধ্যে স্থানীয় লোকেদের অত্যাচারে মহাবীরের মৃত্যু হয় আর তারপর থেকে সুন্দরী জঙ্গলের এত ভেতরে চলে যায় যে তার আর খোঁজ পাওয়া যায় না। তবে বেশ কিছুদিন আগে জানা গেছে, সুন্দরী বাচ্ছা দিয়েছিল। এখানে বড়ো বড়ো জন্তু যতটা না চোখে পড়ে তার থেকে অনেক বেশী ছোট ছোট প্রানীর বৈচিত্র্য দেখা যায়। তবে, হ্যাঁ মহানদীর জলে কুমীর বা ঘড়িয়াল বেশ নজরে আসে। শোনা যায়, মহানদীর মিষ্টি জল তাদের বেশ পছন্দের। তাই নদীর জলে স্নান না করাটাই বুদ্ধিমানের হবে। যদিও কেউ ইচ্ছুক হন তাহলে স্থানীয়দের ভিড় যেখানে সেখানেই নামা উচিত। যদিও আমরা স্নান করার সাহস পাই নি।

যাইহোক বেলা অনেক হয়েছিল, তাই স্নান খাওয়ার তাড়াও ছিল। স্নান করতে গিয়েই টের পেলাম জলটা বেশ ঠান্ডা, তবে গায়ে ঢালতেই সমস্ত ক্লান্তি দূর হল।
তারপর খাওয়া দাওয়া করে চললাম জলপথ ভ্রমণে।
মহানদীর বুকে লঞ্চে করে আধ ঘন্টার বোটিং এই ট্রিপের সবথেকে বেশি আকর্ষণীয় জিনিস।
এটা ওদের প্যাকেজের মধ্যেই থাকে। এবং এর ফাঁকেই আপনি এখানকার ঘড়িয়াল, কুমির দেখে নিতে পারবেন।

সেখান থেকে ফিরে আবার দেখলাম রাতে মনোরঞ্জনের জন্য জলসার ব্যাবস্থা করা হয়েছে। সেখানকার গ্রামীন পালা, গান শুনতে বেশ ভালই লাগবে।

সাতকোশিয়া ঢোকা ইস্তক একটা ঝর্নার কথা খুব শুনছিলাম। তাই ঠিক করলাম পরেরদিন সকাল হলে সেটাই দেখতে যাব সবাই। তবে যেহেতু এটা গভীর জঙ্গলের মধ্যে তাই একা না গিয়ে সঙ্গে কোন স্থানীয়কে নিয়ে যাওয়াই ভাল। যাবার পথে কোন হিংস্র জন্তু হয়তো পড়বে না কিন্তু অচেনা জায়গা তার ওপর গভীর জঙ্গল, তাই সবাই মিলে ঠিক করা গেল স্থানীয় কাউকে নিয়ে যাওয়াটাই শ্রেয়। সত্যিই সুন্দর। গভীর জঙ্গল, প্রচুর রঙবেরঙের প্রজাপতি। এরপর যখন সেই ঝর্ণার সামনে গেলাম সত্যিই অসাধারণ এক অনুভুতি। পাহাড়ি ঝর্ণা না হলেও চারদিক সবুজের মাঝখানে এরকম তিরতিরে এক জলের রেখা যেন জায়গাটাকে স্বপ্নের মতো করে তুলেছে।

যাই হোক দুপুর দুপুর ফিরে আসার পর সন্ধ্যার দিকে চা, পকোড়া খেতে খেতে সূর্যাস্ত দেখা এ আর এক অনুভুতি। প্রথম দিনেও খেয়াল করেছিলাম সূর্যাস্তের সাথে সাথেই আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। শির শিরে ঠান্ডা হাওয়া আর ওই লালচে কমলা আকাশ আমি বহুকাল দেখিনি। ওই দৃশ্য আমার মনে সারা জীবনের জন্য পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিয়েছে। যত রাত বাড়তে থাকলো ঠান্ডা যেন তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকলো। সাড়ে নটার সময় ডিনারের ডাক পড়লো। আমরাও ডিনার করে লেপের তলায় ঢুকে পড়লাম।

পরেরদিন সকাল সকাল সাতকোশিয়াকে বিদায় জানিয়ে ভুবনেশ্বরের দিকে রওনা। এই ভ্রমণে একটা জিনিস বুঝলাম, সাতকোশিয়া এমন একটা জায়গা যেখানে কিছু নেই নেই করেও এমন কিছু জিনিস আছে যার রেশ সারাজীবন মনে থেকে যাবে। আমাদের দৈনন্দিন ও ব্যাবহারিক জীবনের সমস্ত দায়দায়িত্ব, কর্তব্য থেকে দু-চারদিনের ছুটি নিয়ে এরকম সবুজে সজীবত্বের সংস্পর্শে মুক্তির আস্বাদ নিতে বারবার ফিরে আসা যায়। হয়তো, আবার দেখা হবে। তাই, এখনকার মতো বিদায় ‘সাতকোশিয়া’। “চিরকাল এমনই সুন্দর থেকো”।

থাকার ব্যবস্থা : –
১. এসি কটেজ ৪০০০ টাকা (থাকা খাওয়া নিয়ে দুজনের প্রতিরাত)
২. তাঁবু ৩৫০০ টাকা (থাকা খাওয়া নিয়ে দুজনের প্রতিরাত)
অতিরিক্ত সদস্য ১০০০ টাকা (থাকা খাওয়া নিয়ে প্রতিরাত)

বুকিং www.ecotourodisha.com


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

fourteen + 8 =