সামাজিক ঐতিহ্যের কথা

সুপ্রতিক মিত্র : ভারতে শুধু দেবী দুর্গাই নন, অসুরও পূজিত হন বটে!

 ঝাড়খণ্ড এবং জলপাইগুড়ি জেলায় কিছু আদিবাসী গোষ্ঠী বা উপজাতি আছে যাঁরা দাবী করেন যে, তাঁরা মহিষাসুরের বংশধর। তারা দুর্গাপূজার সময়টাতে মহিষাসুরের জন্য শোক পালন করে। তাঁরা মহিষাসুরকে পূজা করেন।

ইন্টানেট ঘেঁটে জানতে পারলাম, ২০০৩ সাল থেকে পুরুলিয়ার ভুলুরডিতে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে শুরু হয় অসুর পূজো।

নৃতাত্বিকদের মতে বাংলা অঞ্চলের প্রাচীণ জনগোষ্ঠী, নিষাদ, কোল, ভীল গোষ্ঠীর মানুষেরা অসুরজাতি, অনার্য। এরাই ভারতের ভূমিপুত্র। এই আদিবাসী গোষ্ঠী বিশেষত সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও সম্প্রদায়ের যুবকরা স্ত্রীলোকের সাজ-পোশাকে দাঁশাই নাচ করতে করতে গ্রামের পথে পথে বেড়ায়। কুড়মি কোবিলা, কোড়া কোবিলা, বাউড়ি, সহিস, মুদি এইসব জাতির মধ্যেও দাঁশাই বা কাঠি নাচের প্রচলন রয়েছে।

দুর্গা পূজোয় এই নাচকে আনন্দ উৎসবের অঙ্গ হিসেবে দেখলেও এই দাঁশাই নাচ দুর্গার বিরুদ্ধাচরণ করে নাচা হয়। আদিবাসি লোককথা অনুযায়ী ‘হুদুড়দুর্গা ঘোডাসুর’ অর্থাৎ রাজা মহিষাসুর যুদ্ধে বিদেশী আর্যরমণী কতৃক পরাজিত হয়ে রাজ্যপাট হারায়। ভারতের প্রকৃত শাসক বিদেশী আর্যদের দ্বারা পরাজিত হয়ে নারীর ছদ্মবেশে জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। ভিক্ষান্নে তাদের জীবন চলতে থাকে। সেই ঘটনা স্মরণ করে দুর্গা তথা আর্যদের বিরুদ্ধে ‘দুঃখ দশাই দাড়াঞ’ পালন করে ভারতের ভূমিপুত্রেরা।

বাঙালীর জীবনে ষাঁড়, মহিষ, বলদ প্রধান। তাদের রক্ষাকর্তা হলেন মহিষাসুর। সেই মহিষাসুকে বধ করেন আনা অর্থাৎ দুর্গা। উদ্দেশ্য বৈদিক তথা হিন্দুত্বের বশ্যতা স্বীকার করানো। এই সময়টা হল প্রাক্-বৈদিক- বৈদিক ধর্ম ওআচার সংশ্লেষের চুড়ান্ত পর্যায়।এর পর থেকেই হিন্দুত্ববাদের শুরু। এই সময়েই অসুর হিসাবে উপজাতিকে চিহ্নিত করা হয় আর দুর্গা দুর্গতিনাশিনী। মাতৃত্বের প্রতীক দেবী দুর্গা আর অসুর অনুন্নত ঘৃন্য জীব।

ইতিহাস, পুরাণ, লোককথা, নৃতত্ত্বের আলোচনা যাই হোক না কেন; বাংলার ভূমিপুত্ররা মহিষাসুরকে তার স্বমহিমা ফিরিয়ে দিতে সচেষ্ট প্রায় ১৫ বছর ধরে। শুরু জলপাইগুড়ি চা বাগানে চরণ বেসরার হাত ধরে।

২০০৩-এ ভারতের নানা জায়গায় মহিষাসুরের সপক্ষে আর হিন্দুত্ববাদের বিপক্ষে এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু হয়।পুরুলিয়ার ভালুরডিতে শুরু হয় মহিষাসুর পূজো, দিল্লির জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় ‘মহিষাসুর সাহদত দিবস’ পালন করে ইতিহাসের গবেষক ছাত্রছাত্রীরা। বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং মূলনিবাসী বহুজন সমাজ নিজেদের মহিষাসুরের উত্তরসুরী বলে চিহ্নিত করে।

দাশাই পরব অসুর-আদিবাসীদের একটি শোকপালনের পরব। পাঁচদিন ধরে চলে এই শোক পালন। কারণ বিদেশী দেবতারা তাদের প্রিয় রাজাকে এক নারীকে দিয়ে হত্যা করেছে।
তাই নারীর ছদ্মবেশে যোদ্ধারা তাদের রাজাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে। হাতের শস্ত্রগুলিকে বাদ্যযন্ত্রের আদল দেওয়া হয়। যাতে সন্ধিক্ষনে যুদ্ধ বিজয়ে সেগুলো কাজে লাগে। মুন্ডা,কোল আদিবাসীরা দাবী করেন দুর্গা তাদের মেয়ে।

হাঁড়ি সম্প্রদায়ের দাবী চণ্ডী তাঁদের মেয়ে। দেবতারা তাকে দিয়ে তাঁদের রাজাকে হত্যা করে। আজও বুক চাপড়ে হায়রে-ও হায়রে আওয়াজ করে ভুয়াং নাচের মাধ্যমে আদিবাসীরা তাঁদের রাজাকে খুঁজে বেড়ায়। বেশ্যা দুর্গার হাতে বৃহৎ বঙ্গের রাজা বোঙ্গাসুর বা উদুরদুর্গা, বা হুদুরদুর্গার (হুদুর মানে বজ্র) হত্যা কাহিনী এভাবেই লোকায়ত হয়ে আছে আদিবাসীদের মধ্যে। আদিবাসী সত্তায় রাজত্ব হারানোর স্মৃতি এখনও সমান ভাবেই বর্তমান। বিদেশী দেবতারা এখনো মানব হত্যার মন্ত্রগুলি বিজয় উল্লাসে উচ্চারণ করে চলছে। মানুষ মারাকে ধর্মীয় মোড়কে পরিবেশন করছে।

ধ্বংস হয়ে যাওয়া ইতিহাস আবার সবলে উঠে আসছে। কৈফিয়ত আদায় করে ছাড়ছে। জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুরুলিয়ার সরডিহার ইতিহাস সচেতন আত্ম মর্যাদা সম্পন্ন মূলনিবাসীরা অসুর পূজা শুরু করে দিয়েছে। সেটা বিস্তারিত হয়ে মালদা, দিনাজপুর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ছড়াতে শুরু করেছে। এ পূজা মানবতার পূজা। অসুরের (সুরাপায়ী নয়) পূজা । অসুরের জয় হোক।

সত্যিই ভারতে বেশ কিছু আদিবাসী এলাকায় ভগবানরূপে পূজিত হন মহিষাসুর ৷ এই আদিবাসীরা মনে করেন, ‘সত্যি’-টা কোনওরকম ভেদাভেদ ছাড়াই সামনে আসা উচিত ৷ মহিষাসুরের আরাধনা করেন এমন এক আদিবাসী সম্প্রদায়ের কারও কারুর বক্তব্য, ‘আমরা সবাই একই মায়ের গর্ভ থেকে জন্মেছি৷ তাই কে অসুর আর কে দেবী, আর কে দলিত অথবা কে উচ্চবর্ণ তা নিয়ে ঝগড়া করার কোনও অর্থ হয় না৷ আমরা মনে করি, অসুর আমাদের রাজা ছিলেন আর দেবী দুর্গা তাঁকে হত্যা করেন ৷ সবসময় তাঁকেই অশুভ শক্তি বলে কেন দেখানো হয় জানি না ৷’

অসুর পূজার নিয়মাবলীর বিষয়ে আদিবাসী সম্প্রদায়ের কেউ কেউ বলেন, ‘আমাদের কাছে মহিষাসুরের কোনও মূর্তি নেই৷ তিনি আমাদের হৃদয়ে থাকেন ৷ তবে অনেক জায়গায় তাঁর মূর্তিও পুজো করা হয় ৷’ এই আদিবাসী গোষ্ঠী ঝাড়খণ্ডের লাতেহার জেলার সখুপানি গ্রামের বাসিন্দা ৷

ঝাড়খণ্ডের অধিবাসী এই অসুর সম্প্রদায়ের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১০ হাজার৷ অসুরকে নিজেদের সম্প্রদায়ের রাজা হিসেবে পুজো করে এই আদিবাসী সম্প্রদায় ৷ এরা মহিষাসুরের মৃত্যুর দুঃখ পালন করে ৷ বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, মহিষাসুরের উপাসক আদিবাসী গোষ্ঠী শুধু ঝাড়খণ্ডেই নয়, বিহার, মধ্যপ্রদেশ এমনকী, পশ্চিমবঙ্গেও দেখা যায় ৷

সুষমা অসুর জানিয়েছেন যে, তাঁরা দেবী দুর্গার পুজো করেন না৷ মহিষাসুর বধের দিন অর্থাৎ দশমী বা দশেরা অন্যরকমভাবে পালন করে অসুর সম্প্রদায় ৷ দেবী দুর্গার ত্রিশূলের আঘাতে মহিষাসুরের দেহের যে যে জায়গা থেকে রক্তপাত হয়েছিল, অসুর সম্প্রদায়ের সব লোক দশমী বা দশেরার দিন নিজের শরীরের সেই সব জায়গায় তেল লাগান৷ যেমন- নিজের নাভি, কান, নাক প্রভৃতি৷ এর পর ৯ দিন ধরে চলে শোক পালন৷ এই অসুর সম্প্রদায় ছাড়াও ‘আলাসা সাঁওতাল’ নামক আদিবাসী সম্প্রদায়ও মহিষাসুরের সঙ্গে সঙ্গে রাবণের মৃত্যুর শোক পালন করে৷

ঝাড়খণ্ডের ঘাগরা, চৈনপুর, বিষণপুর গ্রামের ঘরের জানলা-দরজা বন্ধ থাকে পুজোর চার দিন। যাতে আলোর রোশনাই তো দূর, ঢাকের আওয়াজটাও ভুল করে ঢুকে না পড়ে! এগুলো অসুরদের গ্রাম। যাঁরা বিন্দুমাত্র কুণ্ঠা না করে জানিয়ে দেন, দুর্গাপুজো তাঁদের কাছে পুজো নয়— হত্যাকাণ্ড। তাঁদের ‘পূর্বপুরুষ’ মহিষাসুরের হত্যা। চৈনপুর গ্রামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষেরা বলেন, ‘‘আগে তো নবরাত্রি উৎসবের ন’দিন টানা আমাদের গ্রামে শোকগাথা পাঠ করা হতো। আমরা সাদা থান পরে থাকতাম। মেয়েরা সাদা শাড়ি পরত। এখন সময় পাল্টেছে। সাদা কাপড় পরা বা শোকগাথা পাঠ হয় না। তবে দুর্গাপুজোর সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই।’’ আর এক গ্রামবাসীর কথায়, ‘‘এই উৎসব আমাদের পূর্বপুরুষকে অপমান করার সামিল। মানুষকে হত্যা করা কোনও উৎসব হতে পারে না।’’

রাঁচি থেকে মোটামুটি ৯০ কিলোমিটার এগোলে গুমলা শহর। তারই কিছু দূরে পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা তিন গ্রাম। ঘাগরা, চৈনপুর, বিষণপুরের মতো ঝাড়খণ্ডের লোহারডাগা ও পলামু জেলার কিছু গ্রামেও অসুর সম্প্রদায়ের বাস। শুধু মহিষাসুর বধ নয়, পূজোর পরে দশেরায় রাবন বধও মেনে নিতে পারেন না ওঁরা। গুমলার ঘাগরা গ্রামের মানুষদের কথায়, ‘‘আমরা এখনও দশেরাতে শোক পালন করি। দুর্গাকে বহিরাগত বলে মনে করি আমরা। বরং মহিষাসুর বা রাবণ আমাদের কাছে অনেক কাছের মানুষ।’’ মনে করিয়ে দেওয়া যাক, ২০০৮-এ এক রামলীলা উৎসবে গিয়ে রাবণের মূর্তি জ্বালানোর বিরোধিতা করেছিলেন খোদ শিবু সোরেন।

ঝাড়খণ্ডের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, রাবণকে ‘কুলগুরু’ ও বীরত্বের প্রতীক বলে মনে করেন তিনি।

ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী গবেষণা কেন্দ্রের অধিকর্তা এইচ এস গুপ্ত বলেন, ‘‘এই অসুর জাতি কিন্তু ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী নয়। এঁরা মূলত এসেছেন মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তীসগঢ় থেকে। বহু প্রাচীন কাল থেকেই ওঁদের পেশা হল লোহার নানা জিনিস তৈরি করা।’’ অসুরদের গ্রামে গিয়ে তাঁদের জীবনযাত্রা চাক্ষুস দেখার অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন গুপ্ত। যার মধ্যে অবধারিত ভাবেই ঢুকে পড়ল তাঁদের দুর্গাপুজো ‘গণ-বয়কট’ করার কথাও।এখন অবশ্য সেই জীবনযাত্রায় অনেক বদল এসেছে। লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। পূর্বপুরুষদের ধারা বজায় রেখে কেউ কেউ এখনও লোহার কাজ করেন ঠিকই, কিন্তু ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজে পাঠাতেও ভোলেন না।

প্রাচীন জনজাতি নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন এই সম্প্রদায়ের অনেকে। তেমনই এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মী সুষমা অসুর বলেন, ‘অসুর নিধনের উৎসব’-এর বিরোধিতা করে তাঁরা একটি মঞ্চ তৈরি করেছেন। তৈরি হয়েছে ফেসবুক পেজ। সেখানে তাঁরা সমস্বরে জানাচ্ছেন, ‘‘আমরা অসুর সম্প্রদায় আমাদের পূর্বপুরুষের এই হত্যার উৎসবের বিরোধিতা করছি।’’

ইতিহাস ঘেঁটে পণ্ডিতেরা খুঁজে চলেন অসুর-গ্রামের ক্ষোভের নেপথ্যে ‘আর্য-অনার্যে’র জটিল তত্ত্ব। এই বিষয়ে বিশদ তথ্যের জন্য মাননীয়/মাননীয়া পাঠক কুলের দাক্ষিণ্য-এর ওপর নির্ভর করে রইলাম।

( তথ্যসূত্র :অন্তর্জাল)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

15 − 12 =