ঐতিহ্য ভ্রমণ

সুপ্রতিক মিত্র : আসুন আপনাদের নিয়ে যাই ঝাড়গ্রামের কাছে চিল্কিগড়ে কনক দুর্গা মন্দির দর্শনে।

     আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমি প্রথম ঝাড়গ্রাম যাই। সেখানে আমার এক কাকা ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে কর্মরত। ওনার সঙ্গেই আমি প্রথম দেখতে যাই কনক দুর্গা মন্দির। পরে বিভিন্ন কারণে অনেকবার ঝাড়গ্রাম যাই, এবং প্রায় প্রত্যেক বারই দেখে আসি এই মন্দির ও তার বিগ্রহটি। পরে শুনি প্রকৃত বিগ্রহটি চুরি গেছে। যাক, চলুন আপনাদের নিয়ে যাই মায়ের কাছে।

দেবী কণক দূর্গা :

তথাকথিত ঝাঁ চকচকে নাগরিক জীবনের অনেক বাইরে, ডুলুং নদীর পাড়ে জঙ্গলে ঘেরা চিল্কিগড়ে দেবী কনকদুর্গার অবস্থান। মহাষষ্ঠীর ভোরে সেখানেই বেজে ওঠে বোধনের ঢাক। তারপর চারদিন ধরে চলে নীলসরস্বতীরূপা দেবীর বন্দনা।
১৭৪৯ খ্রীষ্টাব্দে তৎকালীন জামবনি পরগনার সামন্তরাজা গোপীনাথ সিংহমত্ত গজ স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দেবী কনকদুর্গার মন্দির। কথিত, দেবীর মূর্তি তৈরি হয়েছিল রানি গোবিন্দমণির হাতের কঙ্কণ দিয়ে। সেই সোনার বিগ্রহ চুরি হয়ে গেছে বহু বছর আগে। পরে যে অষ্টধাতুর বিগ্রহ তৈরি হয়েছিল, খোয়া গিয়েছে তাও। এখন যে বিগ্রহের অধিষ্ঠান সেটিও অষ্টধাতুর। দেবী এখানে অশ্ববাহিনী চতুর্ভূজা। ত্রিনয়নী, নীলবস্ত্র পরিহিতা। রাজা নেই। নেই রাজত্বও। তবে এখনও নিত্য পুজো হয় এই মন্দিরে। আর মহাষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত বিশেষ আরাধনা।
কনকদুর্গার ভোগে থাকে আমিষেরই প্রাধান্য।ভাত, খিচুড়ি, পঞ্চব্যঞ্জন তো আছেই, দেবী দুর্গার ভোগে দেওয়া হয় হাঁসের ডিম। মনের ইচ্ছা পূরণের জন্য দেবীকে হাঁসের ডিম উৎসর্গ করার রীতি রয়েছে এখানে। নিত্যপুজোতেও অন্নভোগে দেওয়া হয় ডিম। পুজোর ক’দিন বিশেষ আরাধ‌নাতেও বজায় থাকে সেই রীতি। পূজারী আতঙ্কভঞ্জন ষড়ঙ্গী, গৌতম ষড়ঙ্গী জানালেন, অন্য দিনের মতো শারদীয় দুর্গাপুজোর দিনগুলিতেও ষোড়শোপচারে দেবীর পুজো হয়। নৈবেদ্যে ফলমিষ্টি যেমন থাকে, তেমনই দুপুরে অন্নভোগে ঘি-ভাত, খিচুড়ি, পঞ্চব্যঞ্জন, পায়েস, হাঁসের ডিম ও মাছ দেওয়া হয়। হাঁসের ডিমের ভোগকে বলা হয় গঞ্জভোগ। সেদ্ধ হাঁসের ডিম তন্ত্র মতে শোধন করে অন্নভোগের মাঝে দেবীকে নিবেদন করা হয়। অষ্টমীতে দেবীকে উৎসর্গ করা হয় কালো পাঁঠার মাংসের বিরাম ভোগ। মহানবমীতে মন্দির প্রাঙ্গণে হয় পাঁঠা, ভেড়া ও মোষ বলি।
জামবনি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি তথা মন্দির উন্নয়ন কমিটির সহ সভাপতি সমীর ধল বলেন, “দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে সর্বসাধারণকে ভোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। দর্শনার্থীদের আবেদনের ভিত্তিতে দশমীর দিনে হাঁসের ডিমের ভোগের ব্যবস্থা করা হয়। সেই ভোগ পাওয়ার জন্য পঞ্চমী থেকে অগ্রিম বুকিং করতে হয়।’’
কনকদুর্গার সন্তুষ্টি বিধানে হাঁসের ডিমের ভোগ দেওয়ার প্রথাটি চলে আসছে কয়েকশো বছর ধরে । কালিকা পুরাণমতে ও তন্ত্রমতের মিশেলে দেবী আরাধনা হয় ডুলুং পাড়ের চিল্কিগড়ে। শুধু আশেপাশের মানুষই নন, দেবী মাহাত্ম্যের টানে পুজোর চার দিন বহু দূর দূরান্ত থেকেও আসেন দর্শনার্থীরা।

(তথ্য সূত্র: অন্তর্জাল)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

18 + 13 =